সীমান্ত নিরাপত্তায় টহল বৃদ্ধির পাশাপাশি বান্দরবান সীমান্তের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নিরাপত্তা চৌকিগুলোতে আর কে-৩ কোর্সার অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইল (এটিজিএম) মোতায়েন করা হয়েছে।
সম্প্রতি মায়ানমার সীমান্তে ব্যাপক সংঘর্ষ, গুলি ও বোমা বিস্ফোরণের পর অত্যাধুনিক এই অস্ত্রটি মোতায়েন করা হয়। বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনের সময় চৌকিগুলোতে এই অস্ত্রটি দেখেছেন।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বিজিবির ঘুমধুম সীমান্ত চৌকিসহ আরও বেশ কয়েকটি চৌকিতে এটিজিএম মোতায়েন করা হয়েছে। এটিজিএম হলো ইউক্রেনের তৈরি হালকা বহন যোগ্য ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। এটি দিয়ে স্থির ও চলমান সাজোয়া যান এমনকি হেলিকপ্টারেও আক্রমণ করা যায়। ২০০০ সালে ইউক্রেনে এই অস্ত্রটি তৈরি হয়। সীমান্তে অত্যাধুনিক এই অস্ত্রটি মোতায়েনে সীমান্ত সুরক্ষা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বিজিবির আধুনিকায়নে আরও এক ধাপ উন্নতি হলো।
সম্প্রতি বান্দরবান সীমান্তে মায়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সংঘর্ষে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি মর্টার শেল ও গুলি এসে পড়ে। এতে দুজন নিহত ও গুলিবিদ্ধসহ ৯ জন আহত হয়। সীমান্তের ওপারে হেলিকপ্টার থেকেও ব্যাপক গুলি ও বোমা বর্ষণ করা হয়। এসব বিষয় নিয়ে বিজিবি কড়া প্রতিবাদও জানায়।
বান্দরবানের তুমবব্রু সীমান্তে রোববার (১১ ফেব্রুয়ারি) সেনাবাহিনীর বোম ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা সীমান্ত থেকে পাওয়া দুটি রকেট লাঞ্চার বোম নিষ্ক্রিয় করেছে। বিকট শব্দে এগুলো বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়। এ সময় সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
অন্যদিকে বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তের উচ্চ বিদ্যালয়ে অবস্থান করা মায়ানমার বিজিপির ১৫৮ সদস্যকে এখনও সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়নি। তবে দুয়েকদিনের মধ্যে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে উখিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানা গেছে।
বান্দরবান সীমান্তে গোলাগুলি না হওয়ায় পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বেশিভাগ লোকজনই এখন ঘরে ফিরেছে। তবে যে পাঁচটি স্কুল বন্ধ করা হয়েছিল সেগুলো এখনও খোলা হয়নি। পরিস্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে গেলে স্কুলগুলো খুলে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তা ফরিদুল আলম হুসাইনী।
তিনি জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ঘুমধুম এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রটি সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হবে না। তবে পরিস্থিতি খারাপ হলে তা উত্তর ঘুমধুমে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ্ মোজাহিদ উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির পরই বাংলাদেশ অবস্থানকারী মায়ানমারের বিজিপি সদস্যদের সেদেশের জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হবে।
উখিয়ার সীমান্ত খালে ভেসে এসেছে আরও ৪ লাশ। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বালুখালী খালে আরও ৩ ও ইনানী সমুদ্র সৈকতে ১টিসহ ৪ লাশ ভেসে এসেছে। এর মধ্যে উখিয়া থানা পুলিশ রোববার দুপুর ২টার দিকে একটি লাশ উদ্ধার করেছে। উদ্ধার এই লাশের মাথায় হেলমেট ও হাতে গ্লাভস পরা রয়েছে। দুপুরে ইনানী সমুদ্র সৈকতে ভেসে এসেছে মাথাবিহীন একটি মরদেহ। মরদেহটি দেখতে পান সেখানকার স্থানীয় কিটকট ব্যবসায়ীরা।
কিটকট ব্যবসায়ী ছলিম উল্লাহ বলেন, দুপুরের দিকে মরদেহটি ভেসে এসেছে। মরদেহটির মাথা দেখা যায়নি। আমরা প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছি। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) মোহাম্মদ মাসুদ রানা জানান, ইনানী সমুদ্র সৈকতে একটি মরদেহ ভেসে এসেছে। উখিয়া থানাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে।
এছাড়া বালুখালী খালের একেবারে ওপরের দিকে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এলাকায় আরও ২টি লাশ দেখতে পেয়েছে স্থায়ীরা। লাশ ২টি খালের ঝোপের মধ্যে ময়লা আবর্জনায় পড়ে রয়েছে। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে লাশ ২টি দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, লাশগুলো মায়ানমারের বিদ্রোহী কোনো গোষ্ঠীর সদস্যের হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো কিছু বলতে পারেনি পুলিশ।
উখিয়া থানার ওসি শামীম হোসেন বলেন, নাফনদীর সঙ্গে সংযোগ থাকা বালুখালী খালে জোয়ারের পানিতে লাশ ভেসে আসতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেন। সেখান থেকে খবর পেয়ে পুলিশ একটি লাশ উদ্ধার করে। তবে লাশের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। শনাক্তের চেষ্টা চলছে। অন্য ৩টি লাশের ব্যাপারে তিনি কিছুই জানায়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার লাশের মাথায় হেলমেট, হাতে গ্লাভস রয়েছে। লাশটি ফুলে গেছে। পুলিশ ধারণা করছে, কয়েক দিন আগে নিহত হয়েছে।
এর আগে গতকাল শনিবার উখিয়ার সীমান্ত এলাকার রহমতের বিল থেকে অজ্ঞাত পরিচয় একটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের পরিচয় এখনও শনাক্ত হয়নি।
এদিকে, গত কয়েক দিন ধরে নাইক্ষ্যংছড়ি ও উখিয়া সীমান্তের ওপারে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে মায়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির সংঘর্ষ চলছে। ইতোমধ্যে বিজিপিকে হটিয়ে তুমব্রু রাইট ক্যাম্প ও ঢেঁকিবনিয়া সীমান্ত চৌকিসহ বেশ কয়েকটি মায়ানমার জান্তা বাহিনীর ঘাটি আরাকান আর্মি দখলে নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এসব সংঘর্ষে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরও জড়িয়ে পড়ার খবর শুনা গেছে। ভেসে আসা লাশগুলো রাখাইনে সংঘাত সংঘর্ষে নিহতদের হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মায়ানমারের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে আশ্রিত রোহিঙ্গারা!
মায়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাতে বাংলাদেশের ভেতরে থাকা রোহিঙ্গারাও কিভাবে অংশ নিচ্ছে তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। এমন অবস্থায় সীমান্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে সীমান্তের বাসিন্দাদের মধ্যে।
কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফের গ্রামবাসীরা বলছেন, সংঘাতের এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর কেউ কেউ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। কোনো কোনো সংগঠন আবার মায়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ফেলে যাওয়া অস্ত্রগুলো নিয়ে প্রবেশ করছেন বাংলাদেশে।
গত মঙ্গলবার এমন ২৩ জনকে আটকের পর বিজিবি তাদেরকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। তাদের কাছ থেকে ১২টি অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলাম বলেন, এই ২৩ জন ব্যক্তি সশস্ত্র ছিল। যাদের অনেকের কাছে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কার্ড ছিল। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে তারা কেন যাচ্ছে? কিভাবে যাচ্ছে এই প্রশ্ন আমাদেরও।
এ নিয়ে কক্সবাজারে কর্মরত একটি সংস্থার কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ হলে তিনি জানান, আটককৃতদের বেশিরভাগই নবী হোসেনের নেতৃত্বাধীন আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি ও রোহিঙ্গা সলিডারিডি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সদস্য। আটক হওয়ার আগের রাতে আরাকান আর্মির সঙ্গে তাদের যুদ্ধ হয়। এতে তাদের দশজনের মতো লোক মারাও গেছে।