যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যখন ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইউরোপে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছিল। প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে আঘাত হানতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জার্মানিতে মোতায়েন করার পরিকল্পনা ছিল।
ন্যাটো জোটের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় ইউরোপের বড় দুর্বলতা ছিল ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের অভাব। টমাহক সেই ঘাটতি পূরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছিল।
কিন্তু দুই বছর পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। চলতি মাসের শুরুতে জার্মানির সঙ্গে এক বিরোধের জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপে টমাহক সরবরাহ বাতিল করেন। এতে ইউরোপের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা দুর্বলতা আবারও সামনে চলে এসেছে।
এখন বার্লিনের সামনে তিনটি পথ খোলা রয়েছে। তারা হয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আবার ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা করবে, অন্য কোনো দেশ থেকে সমমানের অস্ত্র সংগ্রহ করবে, অথবা ইউরোপের যৌথ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পকে দ্রুত এগিয়ে নেবে।
তবে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, জার্মানির সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে এখন ইউক্রেনের নামও গুরুত্ব পাচ্ছে। বার্লিনের একটি কূটনৈতিক সূত্র বলেছে, “জার্মানি এখনো টমাহক কেনা বা লাইসেন্স নিয়ে নিজ দেশে উৎপাদনের চেষ্টা করছে। তবে আরেকটি বিকল্প হলো ইউক্রেনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা।”
ওয়াশিংটনে জার্মানির কূটনৈতিক তৎপরতা
জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফরে যাচ্ছেন। সফরে তিনি মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং সরাসরি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন।
তবে বার্লিনের রাজনৈতিক মহলে আশঙ্কা রয়েছে, বর্তমান টানাপোড়েনের কারণে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ–এর সঙ্গে বৈঠক নিশ্চিত করাও কঠিন হতে পারে। সেই কারণেই চার দিনের দীর্ঘ সফরসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রিতে সম্মতও হয়, তবুও বড় ধরনের বিলম্ব ও অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে। প্রতি ইউনিট টমাহকের দাম প্রায় ৩৪ লাখ ডলার।
চিন্তন প্রতিষ্ঠান European Council on Foreign Relations–এর নিরাপত্তা বিশ্লেষক রাফায়েল লস বলেছেন, নতুন কোনো চুক্তি হলেও ২০২৯ সালের আগে টমাহক জার্মান বাহিনীর হাতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম।
তিনি আরও বলেন, ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র বিপুলসংখ্যক টমাহক ব্যবহার করায় নতুন সরবরাহে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৮৫০টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ফলে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের অর্ডার করা ক্ষেপণাস্ত্র পেতে দেরির মুখে পড়েছে।
ইউরোপের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি জার্মানি ইউরোপীয় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ‘ইউরোপিয়ান লং-রেঞ্জ স্ট্রাইক অ্যাপ্রোচ’ বা এলসা প্রকল্পকেও এগিয়ে নিতে চাইছে।
ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যকে নিয়ে গঠিত এই কর্মসূচির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপের নিজস্ব প্রযুক্তিতে দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকা বা ইউক্রেনের সহযোগিতা ছাড়া এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
