২০১৪ সালে ইউক্রেনে রাশিয়াপন্থি সরকার হটানোর বিক্ষোভ হয়৷ সেই বিক্ষোভের নাম ইউরোমাইডান বা রেভুলোশন অব ডিগনিটি! গণঅভ্যুত্থানে রাশিয়াপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। নিহত হয় ২০০ অধিক মানুষ। এই গণঅভ্যুত্থানে তৃতীয় পক্ষের স্নাইফারের গুলিতে ছাত্র ও পুলিশ হত্যার মাধ্যমে বিপ্লবকে আরো বেশি প্রভাবিত করা হয়েছিল। মার্কিন ফিল্ম মেইকার জন বেক হফম্যান তাঁর শক্তিশালী ‘মায়দান ম্যাসাকার’ ডকুমেন্টারিতে প্রমাণসহ দেখান – সেই আন্দোলনের উদ্দেশ্য, স্নাইফার দ্বারা হত্যায় আন্দোলনকে কিভাবে প্রভাবিত করা হয়, পশ্চিমা সমর্থিত সরকার বসানোর পেছনের স্বার্থ কি ছিল ইত্যাদি।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র জনতার এক অভ্যুত্থান ঘটে। সংবাদপত্র মতে এখানে নিহত এখন পর্যন্ত ৮৭৫ জন। কিন্তু, ডেইলি স্টারের সংবাদে জানা যায় – ৪’ই আগষ্ট পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১১৩ জন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা যায় হেড স্যুট (৩৯), চেস্ট স্যুট (৩৫ জন)! গতকাল জানা যায় – আন্দোলনের একজন সমন্বয়ক ‘আসিফের মৃত্যু হয় স্নাইফারের গুলিতেই’! তাহলে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় যে – পুলিশের হাতে স্নাইফার নেই, অথচ স্নাইফার আসলো কোত্থেকে? স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা থেকে সরিয়ে ফেলা ব্রি. জে. জনাব সাখাওয়াত হোসেনও বলেছিলেন – ‘নিহতের শরীরে যেই বুলেট পাওয়া গিয়েছে (৭.৬২ মি:মি:), সেগুলো বাংলাদেশ পুলিশ ব্যবহার করেন না। নিষিদ্ধ অস্ত্র সিভিলিয়ানদের হাতে আসলো কিভাবে?’ এমনকি – তিনি এর সুষ্ঠু তদন্তের জন্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাবার কথাও বলেছিলেন। অবশ্য পরে আর তাঁকে ঐ পদে রাখা হয়নি।
যাইহোক। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের বেশ কিছু ভূতুড়ে এবং কাকতালীয় মিল রয়েছে। বিশেষ করে – ২০১৪ সালে ইউক্রেনের সেই অভ্যুত্থানের ৩ টি ধাপ ছিল, বাংলাদেশেও ২০২৪ সালে ৩ টি ধাপ ছিল, এই যেমনঃ ৬জুন-২২ জুন প্রথম ধাপ, ৩০জুন-২২ জুলাই দ্বিতীয় ধাপ, ২৯ জুলাই-৫ই আগষ্ট তৃতীয় ধাপ। আরো কাকতালীয় ব্যাপার – ২০১৪ সালে ইউক্রেনে রাশিয়া পন্থি সরকার হটাতে শেষ ধাপে সময় নিয়েছিল ৬ দিন (১৮ ফেব্রুয়ারী-২৩ ফেব্রুয়ারী)। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে হটাতেও সময় নিয়েছে ৭ দিন (২৯ জুলাই-৫ই আগষ্ট)। এক দফা দাবী তোলা হয় ৩’ই আগষ্ট। ২০১৪ সালের সেই অভ্যুত্থানেও ইউক্রেনের প্রসিডেন্ট রাশিয়ায় চলে যায়, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনাও ভারতে চলে যায়। ২০১৪’তে ইউক্রেনে নিহতদের বড় অংশ ছিল হেড/চেস্ট স্যুট, ২০২৪ সালে বাংলাদেশেও হিস্ট্রি একই। ২০১৪ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডেমোক্রেটিক দলের বারাক ওবামা, তয় ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ইন্টেরিম সরকার গঠনের পর যেই ১৯৮ প্রভাবশালী সমর্থন জানান, সেখানে প্রধান ব্যক্তি হলেন মি. বারাক ওবামা। আবার ২০১৬ সালে মার্কিন নির্বাচনে হিলারি ক্লিন্টন’য়ের ডেমোক্রেটিক দলকে ড. ইউনুস সাহেব ১ লক্ষ থেকে ২.৫ লাখ ডলার তহবিল দিয়েছেন। ব্যাপারগুলো কেমন যেনো কাকতালীয় না?
২০১৪ সালে ইউক্রেন সঙ্কট ইস্যুতে মার্কিন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অফ স্টেট ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড ও ইউক্রেনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জিওফ্রে পাইটের মধ্যে কথিত কথোপকথন ফাঁস হয়ে যায়। যেখানে মূল প্ল্যান ছিল যেকোনভাবেই ইউক্রেন থেকে রাশিয়া পন্থি সরকার হটাতে হবেই।
জাতিসংঘের মহাসচিবের একজন বুদ্ধিদীপ্ত উপদেষ্টা, যিনি আবার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মি. জেফ্রি সাক্স, তিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করে একটি নিবন্ধ লিখেন। ইমরান খানকে সরাতে ডুনাল্ড লু’র ভূমিকা আলোচনা করে বলেছেন – ‘ঠিক একই পন্থা অনুসরণ করে CIA বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন ঘটিয়েছে’। দুটি দেশের সরকার পরিবর্তনের পেছনে তিনি চায়না ও রাশিয়ার উপর এই দুই প্রধানমন্ত্রীর (ইমরান খান, শেখ হাসিনা) নির্ভরশীল, নিরপেক্ষ বিদেশি নীতিকে দায়ী করেছেন। পুরো অভ্যুত্থানটিকে যুক্তরাষ্ট্র-নির্দেশিত ‘মিলিটারি ক্যু’ বলে তিনি চিহ্নিত করেছেন। তিনি দাবী করেন – যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযানের ফলে বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে; যারজন্য জাতীসংঘকে তদন্তের দাবীও জানান তিনি। বলে রাখা ভালো যে – অধ্যাপক জনাব জেফ্রি সাক্স জাতিসংঘের ৩ জন মহাসচিবের উপদেষ্টা ছিলেন। বর্তমান মহাসচিবের সাথেও কাজ করছেন মি. জেফ্রি সাক্স।
চমকে উঠার মতো ব্যাপার যে – শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাবার পর শিক্ষার্থীরা এম টুয়েন্টি ফোর (M24) স্নাইফার উদ্ধার করেন। এই M24 স্নাইপার ওয়েপন সিস্টেম (SWS) বা রেমিংটন মডেল ৭০০ রাইফেলের সামরিক ও পুলিশ সংস্করণ, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর দ্বারা নির্ধারিত মডেলের দূরবর্তী টার্গেট মিশনে স্ট্যান্ডার্ড অস্ত্র! এই অস্ত্রটিতে ৭.৬২ মি:মি ক্যালিবার বুলেট ব্যবহৃত হয়!
ইউক্রেনে রাশিয়াপন্থী সরকারের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের এলাই শক্তি তৎকালীন ইউরোপীয় এলাকার মার্কিন অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি ফর স্টেইটস মি. ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড সেসময় ৫ সপ্তাহে ৩ বার ইউক্রেন সফর করেন। শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকায় আসা মার্কিন প্রতিনিধি দলের ডোনাল্ড লু ইতিমধ্যেই দুবার সফর করে ফেলেছেন। বাংলাদেশের ইস্যুতে প্রতিনিধি দল যা বলেছে, ঐ একই সূরে কথা বলেছিল ইউক্রেনের জনগণের সেই বিজয়কে স্বাগত জানিয়েও। ইউক্রেন ইস্যুতে তারা যা অস্বীকার করে এসেছিল – ‘ইউক্রেনের গণঅভ্যুত্থানে মার্কিন জড়িত নয়’। সেই একইভাবে বলছে – ‘বাংলাদেশের সরকার পতনের পেছনে মার্কিন সম্পৃক্ততা অপ্রাসঙ্গিক’।