ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার আগে তিন পৃষ্ঠার একটি পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন এবং সেটি নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে করে সঙ্গে নিয়ে গেছেন বলে দাবি করেছেন দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। তবে তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: “পৃথিবীর কেউ জানেনি, শেখ হাসিনা নিজেও কাউকে বলেননি, কিন্তু মতি জানলেন কীভাবে?”
রোববার ইউটিউবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দি পোস্ট’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মতিউর রহমান চৌধুরী দাবি করেন, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার আগে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একটি বিস্তারিত পদত্যাগপত্র প্রস্তুত করেছিলেন। তিন পৃষ্ঠার ওই চিঠিতে তিনি সরকারের সাফল্য, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং পদত্যাগের কারণ উল্লেখ করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন কর্মীর মাধ্যমে চিঠিটি টাইপ করার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু গণভবনের বাইরে দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতির কারণে সেটি আর সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত খসড়া চিঠিটি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ব্যাগেই থেকে যায়।
মতিউর রহমান চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, ৫ আগস্ট গণভবনের চারপাশে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত স্থান ত্যাগ করার পরামর্শ দেন। তাড়াহুড়োর মধ্যে তিনি নাকি তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগ ফেলে বেরিয়ে যান। পরে একজন সেনা কর্মকর্তাকে দিয়ে সেই ব্যাগ আনিয়ে নেন। আর সেই ব্যাগেই ছিল কথিত পদত্যাগপত্র।
কিন্তু এখানেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
যদি পদত্যাগপত্রটি কখনও জমা না দেওয়া হয়ে থাকে, যদি সেটি সরকারি কোনো নথিতে পরিণত না হয়ে থাকে, যদি সেটি কেবল শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ব্যাগে সংরক্ষিত থাকে, তাহলে এর অস্তিত্ব, বিষয়বস্তু এবং শেষ মুহূর্তের ঘটনাগুলো সম্পর্কে এত বিস্তারিত তথ্য এল কোথা থেকে?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ বলছেন, একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে মতিউর রহমান চৌধুরীর নির্ভরযোগ্য সূত্র থাকতে পারে। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। ফলে কোনো সূত্রের মাধ্যমে তিনি তথ্য পেয়ে থাকতে পারেন।
অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন আরও সরাসরি। তাদের ভাষায়, “যদি পৃথিবীর কেউ না জানে, যদি শেখ হাসিনা নিজে কখনও এ বিষয়ে কিছু না বলেন, যদি পদত্যাগপত্র জনসমক্ষে না আসে, তাহলে এত বিস্তারিত তথ্য জানার ভিত্তি কী?”
এদিকে এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবার, আওয়ামী লীগের কোনো দায়িত্বশীল নেতা, সেনাবাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। কথিত পদত্যাগপত্রের কোনো কপি, ছবি বা নথিও প্রকাশ্যে আসেনি।
ফলে বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে প্রশ্নও।
সত্যিই কি ছিল সেই তিন পাতার পদত্যাগপত্র?
নাকি এটি এমন একটি দাবি, যার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এখনো প্রয়োজন আরও তথ্য, নথি এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য?
প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এমন একটি দাবি যতটা চাঞ্চল্যকর, তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে আরেকটি প্রশ্ন—
“পৃথিবীর কেউ জানেনি, শেখ হাসিনা কাউকে বলেননি, কিন্তু মতি জানলেন কীভাবে?”
