উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত কিংবদন্তি নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘ ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্রসেনানী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং জনমানুষের নেতা। সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা, নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, প্যারালাইসিসসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁকে স্মরণ করছেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতির এক গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছে।
আট মাসের লড়াই শেষে চিরবিদায়
স্কয়ার হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তোফায়েল আহমেদকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিউমোনিয়াজনিত মারাত্মক শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
পরবর্তী আট মাসেরও বেশি সময় তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এ সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গুজব ছড়ালেও পরিবার ও চিকিৎসকরা নিয়মিতভাবে প্রকৃত তথ্য জানিয়ে আসছিলেন। অবশেষে সোমবার বিকেলে সকল গুজবের অবসান ঘটিয়ে তিনি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন।
ঢাকায় প্রথম জানাজায় মানুষের ঢল
মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভিড় করেন রাজনৈতিক সহকর্মী, দলীয় নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং সাধারণ মানুষ। অনেকেই হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে প্রিয় নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।
পরে তাঁর মরদেহ ধানমণ্ডির ত্বাকওয়া মসজিদে নেওয়া হয়। সেখানে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী গোসল সম্পন্ন করার পর বাদ মাগরিব প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
জানাজার সময় সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। পরিবারের সদস্যদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। উপস্থিত অনেকেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী বলেন, “দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমরা অনেক পথ একসঙ্গে চলেছি। তোফায়েল আহমেদের মতো নেতা সহজে জন্ম নেন না। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনীতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
জন্মভূমি ভোলায় শেষ শয্যা
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, জীবদ্দশায় তোফায়েল আহমেদ প্রায়ই বলতেন, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে তাঁর প্রিয় জন্মস্থান ভোলার মাটিতে সমাহিত করা হয়। সেই ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর মরদেহ ভোলায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভোলা সরকারি জিলা স্কুল মাঠে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর মায়ের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হবে।
তাঁর একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী বলেন, “আমার বাবা সারা জীবন মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন। বিশেষ করে ভোলার মানুষের প্রতি তাঁর ছিল গভীর মমত্ববোধ। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল জন্মস্থানের মাটিতে শায়িত হওয়ার। আমরা তাঁর সেই ইচ্ছাই পূরণ করছি।”
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন জনগণের নেতা
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব শোকবার্তায় বলেন, “তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সাহসী, দূরদর্শী এবং জনগণের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতাসম্পন্ন একজন রাজনৈতিক সংগঠক। তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন সংগ্রামী নায়ককে হারাল। এই ক্ষতি সহজে পূরণ হওয়ার নয়।”
শোকে স্তব্ধ ভোলা
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছার পর ভোলাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। কোড়ালিয়া গ্রামে তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, রাজনৈতিক কর্মী এবং শৈশবের বন্ধুরা। স্থানীয়দের মতে, ভোলার উন্নয়ন, পরিচিতি এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধিতে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভোলাকে পরিচিত করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
ভোলা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, “রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ভোলার মানুষের অভিভাবকসুলভ নেতা। তাঁর মৃত্যুতে ভোলাবাসী একজন অভিজ্ঞ অভিভাবককে হারিয়েছে।”
ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতার উত্থান
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্ররাজনীতির অন্যতম জনপ্রিয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন তিনি। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফাকে ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তিনিই।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অন্যতম আঞ্চলিক অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব, রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী, শিল্পমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশের ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ৯টিতে বিজয়ী হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ, নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সমৃদ্ধ।
এক জীবন্ত ইতিহাসের বিদায়
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে দেশ হারাল স্বাধীনতার সংগ্রামের একজন সাহসী সংগঠক, অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য, দক্ষ প্রশাসক এবং জননেতাকে। তাঁর কর্মময় জীবন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধা, সম্মান ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর অবদান এবং স্মৃতি বেঁচে থাকবে বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায়, মানুষের হৃদয়ে এবং স্বাধীনতার চেতনায়।
