বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটি কি বর্তমান বাস্তবতায় টিকে থাকার মতো ন্যায্য ও প্রয়োজনীয়? সাম্প্রতিক মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় এই প্রশ্নটিকে আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখেনি।
আদালত আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (IEEPA)-এর অধীনে আরোপিত ব্যাপক শুল্ককে বাতিল করে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সেই আইনি ভিত্তিই ভেঙে পড়েছে, যার ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে এই চুক্তিতে আসতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। ফলে, যে ‘অবশ্যই মানতে হবে’—এই ধারণা তৈরি করে চুক্তিটি এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
চুক্তিটি হয়েছিল এক ধরনের তাত্ক্ষণিক ও সর্বব্যাপী শুল্ক হুমকির প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশ তখন এমন একটি পরিস্থিতিতে ছিল, যেখানে এই চাপকে বাস্তব ও অনিবার্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এখন যদি সেই চাপ সৃষ্টির আইনি কাঠামোই অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে চুক্তিটিকে আর স্বাভাবিক বা স্থায়ী সমঝোতা হিসেবে দেখা যায় না।
বরং এটি এমন এক অসম চুক্তি, যার ভিত্তি ছিল চাপ ও অনিশ্চয়তা। উদ্বেগের বিষয় হলো, চুক্তির ভাষা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাব ধরে রাখতে পারে—অর্থাৎ প্রাথমিক হুমকি দুর্বল হলেও চাপের কাঠামো বজায় থাকে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিকল্প চাপ প্রয়োগের উপায় এখনও আছে—যেমন ট্রেড অ্যাক্টের ৩০১ ধারা বা ট্রেড এক্সপ্যানশন অ্যাক্টের ২৩২ ধারা। তবে এগুলো আগের মতো তাৎক্ষণিক, বিস্তৃত এবং একতরফা নয়; বরং এগুলোর প্রক্রিয়া দীর্ঘতর, সীমিত এবং বেশি বিতর্কযোগ্য।
অর্থাৎ, ‘অবশ্যম্ভাবিতা’র যে গল্প বলা হয়েছিল, তা এখন ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশ আর সেই একই ধরনের আইনি ও তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে নেই, যা একসময় এই চুক্তিকে ‘বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে তুলে ধরেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে চুক্তিটি নতুন করে পর্যালোচনা করা যুক্তিযুক্ত। আন্তর্জাতিক উদাহরণও রয়েছে—মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে একই ধরনের চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেছে, কারণ তার ভিত্তিই আর টেকসই নেই।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠছে—কেন একই পরিস্থিতিতে অন্য দেশ যেখানে সরে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশকে এই কাঠামোয় আটকে থাকতে হবে?
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই চুক্তির সঙ্গে জড়িত নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা। যারা এই চুক্তিকে দেশের স্বার্থে অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, তাদের এখন ব্যাখ্যা দিতে হবে—কেন একটি দুর্বল আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো চাপের মুখে নেওয়া সিদ্ধান্ত এখনও বহাল থাকবে?
চুক্তিটি কেবল শুল্কসংক্রান্ত নয়; এটি ক্রয়নীতি, মানদণ্ড, কৌশলগত সম্পর্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার কাঠামো পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই এটি বাতিল বা পুনর্বিবেচনা করা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তও।
এ কথা ঠিক যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। তারা এখনও চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করবে। তবে সেটি আর আগের মতো ‘অপরিহার্য ও অবশ্যম্ভাবী’ নয়।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের উচিত—চুক্তির বাস্তবায়ন স্থগিত রাখা বা অন্ততপক্ষে ব্যাপক পুনরায় আলোচনা শুরু করা। এবং এবার যদি যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের সুবিধা চায়, তাহলে তা যেন একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়—কোনো অবৈধ বা অস্থিতিশীল চাপের ছায়া ছাড়া।
