মানুষকে ভালোবেসে ভাত চেয়েছিল সে। ক্ষুধার্ত পেটে এক থালা ভাতও পেয়েছিল। কিন্তু সেই ভাতের প্রতিটি দানার মূল্য তাকে শোধ করতে হয়েছে নিজের জীবন দিয়ে।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে সংঘটিত তোফাজ্জল হোসেন হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যার ঘটনা নয়, বরং মানবিকতার চরম বিপর্যয়ের এক নির্মম প্রতীক হয়ে আছে। মোবাইল চুরির সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবককে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে নির্যাতন চালিয়ে হত্যার ঘটনায় তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য।
একে একে নিভে যায় পরিবারের সব আলো
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের দুয়ানী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী তোফাজ্জল হোসেন। একসময় তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। বরিশালের বিএম কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। বিভিন্ন থানায় রাইটার হিসেবে চাকরিও করেছেন কয়েক বছর। কিন্তু জীবনের নির্মম আঘাত তাকে ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়।
২০১১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যু, ২০১৩ সালে মায়ের মৃত্যু এবং ২০২৩ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন। ব্যক্তিগত জীবনের নানা ট্র্যাজেডি ও সামাজিক অপমানের ধাক্কায় একসময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কখনও কারও ক্ষতি করেননি। যেখানে যেতেন, শুধু খাবার চাইতেন।
সন্দেহ থেকে শুরু, মৃত্যুর মিছিলে শেষ
ঘটনার দিন দুপুরে হলে কয়েকটি মোবাইল ফোন হারানোর ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যায় তোফাজ্জলকে দেখে কয়েকজন শিক্ষার্থী সন্দেহ প্রকাশ করে। এরপর শুরু হয় মারধর। প্রথমে চড়-থাপ্পড়, পরে লাঠি, স্ট্যাম্প ও বিভিন্ন বস্তু দিয়ে চলে নির্মম নির্যাতন।
তদন্তে উঠে এসেছে, একপর্যায়ে তাকে ক্যান্টিনে নিয়ে ভাত খেতে দেওয়া হয়। ক্ষুধার্ত তোফাজ্জল হয়তো ভেবেছিলেন, এবার মুক্তি মিলবে। কিন্তু খাবার শেষে তাকে আবার গেস্টরুমে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নতুন করে শুরু হয় নির্যাতন। ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে আঘাত, কাঁচি দিয়ে চুল কেটে দেওয়া, লাথি ও ঘুষিতে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা হয় তার শরীর।
বাঁচার সুযোগ পেয়েও বাঁচলেন না
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্যাতনের মাত্রা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গুরুতর আহত ও প্রায় অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকলেও সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রক্টোরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর উদ্যোগ নিলেও নানা কারণে বিলম্ব ঘটে।
অবশেষে রাত প্রায় ১১টার দিকে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও ক্লিপ এবং আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা। তদন্তকারীদের মতে, এটি ছিল সংঘবদ্ধ ও দীর্ঘ সময় ধরে চালানো এক নৃশংস নির্যাতন, যা শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়।
সমাজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন
তোফাজ্জল হোসেনের মৃত্যু কেবল একটি মামলার নথি নয়। এটি সমাজের মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বিচারবোধের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
যে মানুষটি একদিন শিক্ষিত, স্বপ্নবাজ এবং সম্ভাবনাময় যুবক ছিলেন, তিনি জীবনের নির্মম বাস্তবতায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ক্ষুধার্ত পেটে ভাতের আশায় ঘুরে বেড়ানো সেই মানুষটির জীবন শেষ হলো নির্মম প্রহারে।
আইনের বিচারে হয়তো একদিন অপরাধীদের শাস্তি হবে। কিন্তু তোফাজ্জলের শেষ আর্তনাদ, এক থালা ভাতের বিনিময়ে মৃত্যুর সেই বিভীষিকা এবং একটি পরিবারের শেষ প্রদীপ নিভে যাওয়ার বেদনা বাংলাদেশের মানুষের বিবেককে দীর্ঘদিন তাড়া করে ফিরবে।
