একটি সমাজকে বুঝতে হলে দেখতে হয়, সে কাদের মৃত্যু মনে রাখে আর কাদের মৃত্যু নীরবে মাটিচাপা পড়ে যায়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। সরকারি হিসাব একরকম, বেসরকারি হিসাব আরও ভয়ঙ্কর। প্রতিদিন হাসপাতালের বারান্দায়, জরুরি বিভাগের সামনে, গ্রামের ভাঙা ঘরে কিংবা শহরের বস্তিতে অসংখ্য শিশু মারা যাচ্ছে। কিন্তু তাদের মৃত্যু খুব কমই জাতীয় শোক হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে কোনো পরিচিত মুখ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় কেউ মারা গেলে সেটি ঘিরে তীব্র আবেগ, অবিরাম সংবাদ, সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এই বৈপরীত্য শুধু মিডিয়ার নয়, পুরো সমাজের শ্রেণিগত বাস্তবতাকে সামনে আনে।
সমস্যাটা এখানে নয় যে কোনো পরিচিত মানুষের মৃত্যুতে মানুষ শোক করবে কেন। মানুষ অবশ্যই করবে। সমস্যা হচ্ছে, দরিদ্র মানুষের মৃত্যু কেন একই মানবিক গুরুত্ব পায় না।
যে শিশুটি অপুষ্টিতে মারা যায়, যে মা চিকিৎসার অভাবে সন্তান হারায়, যে পরিবার হাসপাতালের মেঝেতে বসে শেষ নিঃশ্বাস দেখতে বাধ্য হয়, তাদের গল্পগুলো খুব দ্রুত হারিয়ে যায়। কারণ তারা ক্ষমতার কেন্দ্রের মানুষ নয়। তারা ক্যামেরাবান্ধব নয়। তাদের ভাষা পরিশীলিত নয়, তাদের সামাজিক প্রভাব নেই, তাদের পেছনে প্রভাবশালী শ্রেণির সমর্থন নেই।
এই সমাজে দৃশ্যমান হওয়ারও এক ধরনের শ্রেণি আছে। কারো মৃত্যু “জাতীয় ট্র্যাজেডি” হয়ে ওঠে, আবার কারো মৃত্যু কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকে।
মিডিয়া, সুশীল সমাজ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির ওপর দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ আছে যে তারা সুবিধাভোগী শ্রেণির প্রতি বেশি সংবেদনশীল। ফলে সমাজের প্রান্তিক মানুষের কষ্ট প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।
কিন্তু ইতিহাস বলে, অবহেলিত মানুষের কান্না কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সমাজ যখন দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, অবিচার ও শ্রেণিগত বৈপরীত্যকে উপেক্ষা করে, তখন ক্ষোভ জমতে থাকে নীরবে।
একটি রাষ্ট্র বা সমাজের মানবিকতা যাচাই হয় সবচেয়ে দুর্বল মানুষের প্রতি তার আচরণে। যদি দরিদ্র শিশুর মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা হয়ে যায়, আর ক্ষমতাবান বা পরিচিত মানুষের মৃত্যু হয় জাতীয় আবেগের কেন্দ্র, তাহলে সেখানে মানবিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে।
শোকেরও যদি শ্রেণি তৈরি হয়, তাহলে সেটি শুধু সামাজিক বৈষম্য নয়, নৈতিক সংকটও।
