বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে: কেন আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে?
অনেকেই এর উত্তর খুঁজছেন সরকারের ব্যর্থতায়, অর্থনৈতিক সংকটে কিংবা প্রশাসনিক অদক্ষতায়। এসব কারণ অবশ্যই আছে। কিন্তু এর বাইরেও আরও গভীর একটি কারণ রয়েছে, যা অনেকেই হয়তো বুঝতে চান না কিংবা বুঝেও এড়িয়ে যান। সেটি হলো, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতির প্রতিষ্ঠাকালীন চেতনাকে অস্বীকার করার রাজনৈতিক চেষ্টা।
বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই রাষ্ট্রের ভিত্তি, জাতীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক আত্মা গড়ে উঠেছে সেই ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে। ফলে একাত্তরকে “রিসেট” করার ভাষা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক অবস্থানকে অস্বীকার করা, কিংবা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরকে ঘিরে উগ্র আচরণ সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশের মধ্যে গভীর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, সরকারবিরোধী আন্দোলনও থাকবে। কিন্তু ইতিহাস ও জাতিসত্তার প্রশ্নে সংঘাত তৈরি হলে সেটি রাজনৈতিক সীমা অতিক্রম করে সাংস্কৃতিক ও মানসিক প্রতিরোধে রূপ নেয়।
বাংলাদেশের মানুষ বহু রাজনৈতিক দলকে প্রত্যাখ্যান করেছে, আবার গ্রহণও করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জাতির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা এ দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী কখনো সহজভাবে নেয়নি।
এখানে আরেকটি বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে, তাদের একটি অংশের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচনা রয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু আবেগ দিয়ে হয় না; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইতিহাস সম্পর্কে সংবেদনশীলতা।
মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙচুর, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান কিংবা ঐতিহাসিক প্রতীকগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক আচরণ সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার বদলে উল্টো তাদের প্রতি সহানুভূতি বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ থাকবে কি থাকবে না, সেটি শেষ পর্যন্ত জনগণই নির্ধারণ করবে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: ইতিহাসের সঙ্গে লড়াই করে কোনো রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না।
ইতিহাস কেবল অতীত নয়, এটি একটি জাতির শেকড়। আর যে রাজনীতি নিজের শেকড়ের সঙ্গেই সংঘাতে জড়ায়, তার ভবিষ্যৎ দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
